বাংলাদেশে কোরবানির উপযুক্ত সুস্থ গরু যেভাবে চিনবেন

qurbani-sustho-goru-chenar-upay-bangladesh

পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে এলেই দেশের বিভিন্ন পশুর হাটে বাড়তে থাকে কোরবানির পশুর বেচাকেনা। তবে প্রতি বছরই অনেক ক্রেতা অসুস্থ, কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করা কিংবা কোরবানির অনুপযুক্ত গরু কিনে প্রতারণার শিকার হন। বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু সাধারণ লক্ষণ জানলেই সহজে সুস্থ ও কোরবানির উপযুক্ত গরু শনাক্ত করা সম্ভব।

পশু চিকিৎসক ও প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গরু কেনার আগে শুধু আকার বা ওজন দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। বরং গরুর শারীরিক অবস্থা, আচরণ, বয়স এবং চলাফেরা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

গরুর বয়স যাচাই জরুরি

ইসলামী বিধান অনুযায়ী কোরবানির গরুর বয়স কমপক্ষে দুই বছর হতে হবে। সাধারণত দাঁত দেখে গরুর বয়স নির্ধারণ করা হয়। নিচের পাটিতে যদি অন্তত দুটি স্থায়ী বড় দাঁত দেখা যায়, তাহলে গরুটি দুই বছর পার করেছে বলে ধরা হয়।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশু বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, সুস্থ গরু চেনার জন্য কিছু নির্দিষ্ট বিষয় খেয়াল রাখলে সহজেই ভালো পশু নির্বাচন করা সম্ভব।

সুস্থ ও অসুস্থ গরু সনাক্তের উপায়

১. শরীর অস্বাভাবিক ফুলে থাকলে সতর্ক হোন

রাসায়নিক বা স্টেরয়েড ব্যবহার করে মোটাতাজা করা গরুর শরীরের মাংসপেশি ও অন্যান্য অঙ্গ অস্বাভাবিকভাবে ফুলে থাকে। শরীরে পানি জমে যাওয়ার কারণে শরীরের কোনো অংশে চাপ দিলে সেখানে গর্ত হয়ে যায় এবং স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সময় নেয়। এটি অসুস্থ বা কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করার বড় লক্ষণ।

২. চলাফেরা স্বাভাবিক কিনা দেখুন

অতিরিক্ত ওজন ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে রাসায়নিকযুক্ত গরু স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে পারে না। অনেক সময় দাঁড়িয়ে থাকলেও নড়াচড়া কম করে। অন্যদিকে সুস্থ গরু সচল, চটপটে এবং স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করে।

৩. গরু ঝিমাচ্ছে কিনা লক্ষ্য করুন

স্টেরয়েড বা ওষুধ খাওয়ানো গরু সাধারণত ক্লান্ত ও ঝিমানো অবস্থায় থাকে। সুস্থ গরু পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির প্রতি দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং কান ও লেজ নেড়ে মশা-মাছি তাড়ায়।

৪. শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হলে বুঝতে হবে সমস্যা আছে

রাসায়নিক বা অতিরিক্ত ওষুধ প্রয়োগে গরুর শরীরের ভেতরের অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। ফলে এসব গরুর শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হয় এবং দেখে মনে হয় যেন হাঁপাচ্ছে।

৫. মুখ দিয়ে অতিরিক্ত লালা ঝরছে কিনা দেখুন

অতিরিক্ত স্টেরয়েড দেয়া গরুর মুখ থেকে প্রায়ই লালা ঝরতে দেখা যায়। এসব গরু অনেক সময় খাবার খেতে চায় না। সুস্থ গরুর সামনে খাবার ধরলে সেটি আগ্রহ নিয়ে খায় অথবা স্বাভাবিকভাবে জাবর কাটে।

৬. নাক শুকনা নাকি ভেজা খেয়াল করুন

সুস্থ গরুর নাকের উপরের অংশ সাধারণত ভেজা বা ঘামযুক্ত থাকে। কিন্তু অসুস্থ গরুর নাক শুকনা দেখা যায়।

৭. শরীরের রঙ ও চামড়া পর্যবেক্ষণ করুন

সুস্থ গরুর শরীরের রঙ উজ্জ্বল থাকে এবং পিঠের কুঁজ টানটান ও দাগমুক্ত হয়। অসুস্থ গরুর শরীর অনেক সময় নিস্তেজ দেখায়।

৮. রানের মাংস শক্ত কিনা পরীক্ষা করুন

সুস্থ গরুর রানের মাংস শক্ত ও দৃঢ় হয়। কিন্তু রাসায়নিক প্রয়োগ করা গরুর পা বা রানের অংশ নরম ও থলথলে হয়ে যায়।

৯. শরীরের তাপমাত্রা বেশি কিনা দেখুন

গরুর শরীরে হাত দিলে যদি অস্বাভাবিক গরম মনে হয়, তাহলে বুঝতে হবে গরুটি অসুস্থ হতে পারে।

১০. পাঁজরের হাড় বোঝা যায় কিনা

সুস্থ গরুর শরীরে হাত দিলে কয়েকটি পাঁজরের হাড় বোঝা যায়। অতিরিক্ত মোটাতাজা বা ফোলা গরুর ক্ষেত্রে এটি বোঝা কঠিন হয়।

কোরবানির উপযুক্ত পশু কেমন হবে

বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম উপায়ে মোটাতাজা করা অনেক গরু কেনার পর অসুস্থ হয়ে পড়ে বা কোরবানির অযোগ্য হয়ে যেতে পারে। এজন্য দেশি গরু কেনাকে তুলনামূলক নিরাপদ মনে করা হয়। কারণ দেশি গরুকে অতিরিক্তভাবে মোটাতাজা করা কঠিন।

১. গরুর বয়স কমপক্ষে দুই বছর হতে হবে

ইসলামী বিধান অনুযায়ী গরুর বয়স ন্যূনতম দুই বছর হতে হবে। বয়স যাচাইয়ের জন্য দাঁত পরীক্ষা করা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি। গরুর নিচের পাটিতে যদি দুধ দাঁতের পাশাপাশি সামনে অন্তত দুটি কোদালের মতো স্থায়ী দাঁত দেখা যায়, তাহলে বুঝতে হবে গরুটি কোরবানির উপযুক্ত বয়সে পৌঁছেছে।

২. পশুকে সম্পূর্ণ সুস্থ হতে হবে

কোরবানির পশুর শরীরে কোনো বড় ত্রুটি থাকা যাবে না। তাই গরুর শিং ভাঙা, লেজ কাটা, মুখ, জিহ্বা, শরীর, পা, ক্ষুর বা গোড়ালিতে কোনো ক্ষত আছে কিনা তা ভালোভাবে দেখে নিতে হবে।

৩. গর্ভবতী গাভী কোরবানি দেওয়া যাবে না

গাভী কোরবানি দেওয়া জায়েজ হলেও সেটি গর্ভবতী কিনা তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। গর্ভবতী গাভী কোনো অবস্থাতেই কোরবানি দেওয়া উচিত নয়। সাধারণত গর্ভবতী গাভীর পেট ও ওলান কিছুটা স্ফীত থাকে।

দক্ষ পশু ক্রেতাদের পরামর্শ

অভিজ্ঞ পশু ক্রেতারা দিনের আলো থাকতে গরু কেনার পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, রাতের বেলায় গরুর স্বাস্থ্য ও শারীরিক অবস্থা ভালোভাবে যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। গাবতলী হাটের খামার ব্যবসায়ী বলেন, “শুধু মোটা গরু না দেখে সুস্থ গরু কোরবানি দেওয়ার ব্যাপারে মানুষের আগ্রহ বাড়াতে হবে।”

বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, গরু কেনার সময় সম্ভব হলে অভিজ্ঞ কাউকে সঙ্গে নেওয়া উচিত এবং প্রয়োজনে পশু চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া ভালো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *