কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দুনিয়ায় এতদিন পর্যন্ত মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল মানুষের মতো কথা বলা AI। ChatGPT, Gemini কিংবা Claude—সবগুলোই এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে তারা একজন বুদ্ধিমান সহচরের মতো ব্যবহারকারীর সঙ্গে আলাপ করতে পারে। কিন্তু এই চ্যাটকেন্দ্রিক AI ব্যবস্থার একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো—এরা কাজের চেয়ে কথায় বেশি সময় নেয়। কোড, অ্যাপ বা কোনো নির্দিষ্ট আউটপুট চাইলে আগে দীর্ঘ ব্যাখ্যা, তারপর ধীরে ধীরে ফলাফল আসে।
২০২৬ সালের শুরুতেই চীন সেই ধারা ভেঙে দিয়েছে। Zhipu AI এর নতুন মডেল GLM-4.7 প্রমাণ করেছে, AI শুধু কথা বলার যন্ত্র নয়—এটি হতে পারে একজন নিঃশব্দ কিন্তু অত্যন্ত দক্ষ কর্মী।
GLM-4.7 রিলিজের মাধ্যমে চীনের বড় বার্তা
২০২৬ সালের মাত্র দ্বিতীয় সপ্তাহেই GLM-4.7 রিলিজ দিয়ে চীন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে AI রেস এখন আর এককভাবে আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে নেই। এতদিন ধারণা ছিল, সর্বাধুনিক মডেল মানেই সিলিকন ভ্যালির কোনো প্রজেক্ট। কিন্তু Zhipu AI সেই ধারণা ভেঙে দিয়ে দেখিয়েছে, প্রযুক্তিগত দিক থেকে চীন শুধু অনুসরণকারী নয়, বরং নেতৃত্ব দেওয়ার অবস্থানে চলে এসেছে। GLM-4.7 কেবল একটি আপডেটেড মডেল নয়, এটি AI ব্যবহারের দর্শন বদলে দেওয়ার একটি ঘোষণা।
কথোপকথনের বদলে কাজের অগ্রাধিকার
GLM-4.7 এর সবচেয়ে বড় পার্থক্য লুকিয়ে আছে এর মানসিকতায়। যেখানে পশ্চিমা AI মডেলগুলো Conversation First নীতিতে তৈরি, সেখানে GLM-4.7 তৈরি হয়েছে Task Completion First দর্শনের ওপর ভিত্তি করে। এই AI কে কোনো কাজ দিলে সে ব্যবহারকারীর সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় আলোচনা বা ব্যাখ্যায় যায় না।
একটি অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট হোক বা কোনো ডিজিটাল আউটপুট তৈরি—GLM-4.7 সরাসরি ফলাফল দিতে চায়। এটি এমনভাবে কাজ করে যেন ব্যবহারকারী একজন সহকারীকে নির্দেশ দিচ্ছেন, যে প্রশ্ন না করে শুধু দায়িত্ব পালন করে।
ওপেন সোর্স করে দিয়ে চীনের সাহসী সিদ্ধান্ত
GLM-4.7 নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো এর ওপেন সোর্স স্ট্যাটাস। যখন বিশ্বের বড় বড় AI কোম্পানি তাদের মডেল ব্যবহারের জন্য মাসিক সাবস্ক্রিপশন নির্ধারণ করেছে, তখন Zhipu AI সম্পূর্ণ বিপরীত পথ বেছে নিয়েছে। GLM-4.7 কে ওপেন সোর্স করে দিয়ে তারা ডেভেলপারদের জন্য বিশাল সুযোগ তৈরি করেছে।
এর ফলে ছোট স্টার্টআপ থেকে শুরু করে স্বাধীন ডেভেলপাররা কোনো আর্থিক বাধা ছাড়াই এই শক্তিশালী AI নিজেদের প্রোজেক্টে ব্যবহার করতে পারবে। এটি শুধুই প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং বৈশ্বিক AI ইকোসিস্টেমে আধিপত্য বিস্তারের একটি কৌশল।
GLM-4.7 এর সক্ষমতা কেন সবাইকে অবাক করছে
GLM-4.7 এর ডেমোতে দেখা গেছে, এটি একটি সিঙ্গেল প্রম্পট থেকেই পূর্ণাঙ্গ অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করতে সক্ষম। শুধু কোড লেখা নয়, ভিজ্যুয়াল উপস্থাপন, 3D ইন্টারঅ্যাকশন এবং প্রেজেন্টেশন লেভেলের আউটপুট তৈরি করাও এর জন্য স্বাভাবিক ব্যাপার।
এই মডেলটি মূলত Agentic AI ধারণার বাস্তব উদাহরণ, যেখানে AI নিজে সিদ্ধান্ত নেয় কীভাবে একটি কাজ শুরু করবে, কোন ধাপে এগোবে এবং কীভাবে কাজটি শেষ করবে।
পশ্চিমা AI বনাম চীনা AI দর্শনের দ্বন্দ্ব
এই মুহূর্তে AI বিশ্বে যে প্রতিযোগিতা চলছে, সেটি আসলে প্রযুক্তির নয়, দর্শনের লড়াই। পশ্চিমা বিশ্ব এমন AI বানাতে চায় যা মানুষের সঙ্গে বন্ধুর মতো কথা বলবে এবং আবেগগতভাবে যুক্ত থাকবে। অন্যদিকে চীন এমন AI তৈরি করতে চায় যা মানুষের কাজের চাপ কমিয়ে দেবে এবং নিখুঁতভাবে দায়িত্ব পালন করবে।
GLM-4.7 সেই দর্শনেরই বাস্তব রূপ, যেখানে আবেগ নয়—দক্ষতা মুখ্য।
২০২৬ সালের AI ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাচ্ছে
২০২৬ সাল স্পষ্ট করে দিচ্ছে, ভবিষ্যতের AI হবে কম কথা বলা কিন্তু বেশি কাজ করা। যেসব প্রতিষ্ঠান, ডেভেলপার বা পেশাজীবী প্রোডাক্টিভিটিকে অগ্রাধিকার দেন, তাদের জন্য GLM-4.7 টাইপ মডেলই হবে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।
এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত পরিষ্কার—আগামী দিনে AI এর সাফল্য মাপা হবে কতটা সুন্দর কথা বলতে পারে তার ওপর নয়, বরং কত দ্রুত এবং নির্ভুলভাবে কাজ শেষ করতে পারে তার ওপর।
ডেভেলপারদের জন্য কেন এটি টার্নিং পয়েন্ট
যারা প্রযুক্তি খাতে কাজ করছেন, তাদের জন্য GLM-4.7 একটি সতর্ক সংকেত। এটি দেখিয়ে দিয়েছে, ওপেন সোর্স এবং এক্সিকিউশন-কেন্দ্রিক AI ভবিষ্যতে ইন্ডাস্ট্রির মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।
২০২৬ সালে যে AI সবচেয়ে ভালোভাবে কাজ শেষ করতে পারবে, প্রযুক্তির রাজত্বও শেষ পর্যন্ত তার হাতেই যাবে—GLM-4.7 সেই দৌড়ে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে শক্তিশালী দাবিদার।
