আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশ থেকে আসা বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য টিউশন ফি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্যারিস-১ পন্থেও সর্বন বিশ্ববিদ্যালয়। মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টির সিদ্ধান্ত ঘিরে ইতোমধ্যেই শিক্ষার্থী ও শিক্ষকসমাজে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্ত শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ এবং জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকাভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর শিক্ষার্থীরাও এই ফি বৃদ্ধির বাইরে থাকবেন।
প্রশাসনিক পরিষদের সংকীর্ণ ভোটে সিদ্ধান্ত
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক পরিষদের ভোটের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। ভোটের ফলাফল ছিল অত্যন্ত কাছাকাছি—১৮টি ভোট সিদ্ধান্তের পক্ষে, ১৫টি বিপক্ষে এবং তিন জন ভোটদানে বিরত ছিলেন। এত অল্প ব্যবধানে গৃহীত সিদ্ধান্ত হওয়ায় বিষয়টি আরও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে। ফলে ওই সময় থেকেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশ থেকে আগত শিক্ষার্থীদের বর্তমানের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি ভর্তি ফি দিতে হবে।
কারা ছাড় পাচ্ছেন, কারা পড়ছেন চাপে
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ, শরণার্থী, আশ্রয়প্রার্থী এবং জাতিসংঘ ঘোষিত ৪৪টি স্বল্পোন্নত দেশের শিক্ষার্থীরা ফরাসি শিক্ষার্থীদের সমান ফিতে পড়াশোনার সুযোগ পাবেন। এই তালিকায় আফ্রিকার বহু দেশ রয়েছে—যেমন সেনেগাল, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, মাদাগাস্কারসহ আরও কয়েকটি দেশ।
তবে জাতিসংঘের ওই তালিকায় নেই এমন দেশগুলো—যেমন আলজেরিয়া, মরক্কো, টিউনিশিয়া ও মিশর—এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
২০২৬ সাল থেকে এসব দেশের শিক্ষার্থীদের লাইসেন্স (ব্যাচেলর) কোর্সে ভর্তি হতে দিতে হবে প্রায় ২ হাজার ৯০০ ইউরো, যেখানে বর্তমানে ফি মাত্র ১৮০ ইউরো। মাস্টার্স কোর্সের ক্ষেত্রে নতুন ফি প্রায় ৪ হাজার ইউরো, যা বর্তমানে ২৫০ ইউরো।
বাজেট ঘাটতি ও সাশ্রয়ের চাপ
রেডিও ফ্রান্স ইন্টারন্যাশনালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, একাধিক রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের আর্থিক প্রভাব দীর্ঘদিন ধরে বহন করতে গিয়ে তাদের আর্থিক পরিস্থিতি দুর্বল হয়ে পড়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, কর্মীদের স্বার্থে নেওয়া কিছু রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের পুরো আর্থিক ক্ষতিপূরণ সরকার দেয়নি। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে গুরুতর বাজেট ঘাটতির মুখে পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ১৩ মিলিয়ন ইউরো সাশ্রয়ের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই সংকট শুধু প্যারিস-১ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ফ্রান্সের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়প্রধানদের সংগঠন জানিয়েছে, দেশের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ই বর্তমানে বাজেট ঘাটতিতে রয়েছে।
২০২৬ সালের জন্য উচ্চশিক্ষা খাতে অতিরিক্ত ১৭৫ মিলিয়ন ইউরো বরাদ্দের পরিকল্পনা থাকলেও, শিক্ষক ও গবেষকদের ইউনিয়ন সিজিটি-এফইআরসি বলছে—মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব মোকাবিলায় এই অর্থ যথেষ্ট নয়।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের তীব্র আপত্তি
প্যারিস-১ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ও গবেষক মারি-এমানুয়েল পোমারল বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সংকট এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। তিনি জানান, তাদের বিশ্ববিদ্যালয় নথিপত্র ও বই কেনার ক্ষেত্রে প্রায় ৯০ শতাংশ বিনিয়োগ বন্ধ করে দিয়েছে।
তবে তাঁর মতে, বিদেশি শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত ফি চাপানো কোনো সমাধান নয়। তিনি বলেন, “একই শিক্ষার পরিবেশে কেউ সামান্য ফি দেবে, আর অন্যকে হাজার হাজার ইউরো দিতে হবে—এটা স্পষ্টতই বৈষম্যমূলক।”
নতুন সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবিতে প্যারিস-১-এর শতাধিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট ক্রিস্তিন নো-ল্যদুকের কাছে একটি উন্মুক্ত চিঠিতে সই করেছেন।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আশঙ্কা, এই ফি বৃদ্ধি বিদেশি শিক্ষার্থীদের আর্থিক ও প্রশাসনিক সংকট আরও বাড়াবে। অনেক শিক্ষার্থী আগে থেকেই ভিসা জটিলতা, রেসিডেন্স পারমিট পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা এবং ফ্রান্সে আসার উচ্চ ব্যয়ের সঙ্গে লড়াই করছেন।
এপিএল বন্ধের প্রস্তাবেও বাড়ছে উদ্বেগ
২০২৬ সালের বাজেট আইনের খসড়ায় বৃত্তিহীন বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য এপিএল (আবাসন সহায়তা) বন্ধ করার একটি প্রস্তাবও রয়েছে। এই সহায়তা কয়েকশো ইউরো হলেও বহু শিক্ষার্থীর জন্য তা বাসস্থানের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা এই সুবিধা পেয়ে থাকেন। গবেষক পোমারলের মতে, একের পর এক বাধা তৈরি হলে অনেক শিক্ষার্থীই ফ্রান্সকে উচ্চশিক্ষার গন্তব্য হিসেবে বেছে নেবেন না।
তিনি বলেন, ইতোমধ্যেই আফ্রিকার অনেক শিক্ষার্থী তুরস্ক, চীন ও রাশিয়াকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন; তাদের পছন্দের তালিকায় ফ্রান্স ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে।
প্রভাবিত হবেন প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী
প্যারিস-১ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছর প্রায় ৪৫ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেন। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে প্রায় এক হাজার বিদেশি শিক্ষার্থী সরাসরি প্রভাবিত হবেন, যাদের বড় অংশ মরক্কো, আলজেরিয়া, চীন, মিশর ও টিউনিশিয়া থেকে আসা।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে ফরাসি সরকারের “ওয়েলকাম টু ফ্রান্স” নীতিমালার মাধ্যমে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ভিন্ন ফি নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হয়। তবে বৈষম্যমূলক বিবেচনায় অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এই নীতি এতদিন প্রয়োগ করেনি। প্যারিস-১-ও সেই তালিকায় ছিল।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বাজেট পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তারা এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার চেষ্টা করবে।
