দেশের দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নতুন উদ্যোগ হিসেবে চালু হতে যাচ্ছে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক চাপের সময় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে এবং আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে নতুন সরকার এই কর্মসূচির পরিকল্পনা করেছে।
আসন্ন ঈদের আগেই এই কর্মসূচির পাইলট প্রকল্প শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত সুবিধাভোগীদের মাসে ২ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হতে পারে।
এই আর্টিকেলে বিস্তারিত জানবেন — ফ্যামিলি কার্ড কী, কারা পাবেন, সুবিধা কী, আবেদন পদ্ধতি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং সরকারের পরিকল্পনা।
ফ্যামিলি কার্ড কী?
ফ্যামিলি কার্ড হলো সরকারের একটি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতাভুক্ত বিশেষ সুবিধা বা পরিচয় ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে দেশের দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারকে আর্থিক সহায়তা বা ভর্তুকি সুবিধা দেওয়া হয়।
এই কার্ডের মাধ্যমে নির্বাচিত পরিবারগুলো সাধারণত—
✅ মাসিক নগদ অর্থ সহায়তা পেতে পারে
✅ কম দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পারে (কিছু কর্মসূচিতে)
✅ সরকারি সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা পায়
✅ অর্থনৈতিক সংকট বা মূল্যস্ফীতির সময় সহায়তা পায়
বাংলাদেশে নতুন ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির লক্ষ্য হলো দরিদ্র পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং সরকারি সহায়তা সরাসরি উপকারভোগীর কাছে পৌঁছে দেওয়া। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজ করছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়।
মাসে কত টাকা পাবেন?
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী:
- প্রতি সুবিধাভোগী পরিবার মাসে ২ হাজার টাকা পেতে পারে
- সম্ভাব্য সুবিধাভোগী: ৫০ লাখ পরিবার
- বছরে সম্ভাব্য ব্যয়: ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি
এটি দেশের অন্যতম বড় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে পরিণত হতে পারে।
পাইলট প্রকল্প কোথায় শুরু হচ্ছে?
প্রাথমিকভাবে দেশের কিছু এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে (পাইলট প্রকল্প) চালু করা হবে। নির্বাচিত এলাকাগুলো
- বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলা
- দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলা
- বগুড়া ও দিনাজপুরের মোট ৮টি উপজেলায় পরীক্ষামূলক কার্যক্রম
সরকার জানিয়েছে, প্রকল্প সফল হলে পর্যায়ক্রমে সারা দেশে চালু করা হবে।
সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন জানিয়েছেন, হতদরিদ্র ও দরিদ্র পরিবারগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই কার্ড পাবেন।
কারা ফ্যামিলি কার্ড পাবেন?
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নিচের পরিবারগুলো অগ্রাধিকার পাবে:
- হতদরিদ্র পরিবার
- নিম্ন আয়ের পরিবার
- কর্মহীন বা অনিশ্চিত আয়ের মানুষ
- সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বাইরে থাকা দরিদ্র জনগোষ্ঠী
- অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার
সুবিধাভোগী বাছাইয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS)-এর সর্বশেষ খানা জরিপ ব্যবহার করা হবে।
ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা ও লক্ষ্য
সরাসরি নগদ সহায়তা
নির্বাচিত পরিবারগুলোকে সরাসরি নগদ অর্থ দেওয়া হবে, যা দৈনন্দিন খরচে সহায়তা করবে।
নারীর ক্ষমতায়ন
সহায়তার অর্থ পরিবারের নারী সদস্য বা গৃহকর্ত্রীর হাতে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যা নারীর আর্থিক ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বেশি সহায়তা
বর্তমান সামাজিক ভাতার তুলনায় এই কর্মসূচিতে সহায়তার পরিমাণ বেশি হতে পারে।
স্বচ্ছতা নিশ্চিত
ডিজিটাল ডেটাবেস ব্যবস্থার মাধ্যমে দুর্নীতি ও অনিয়ম কমানো হবে।
আবেদন প্রক্রিয়া ও তথ্য সংগ্রহ
সরকার একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেস তৈরি করবে, যেখানে জাতীয় পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে পরিবারের তথ্য সংরক্ষণ করা হবে।
আবেদন প্রক্রিয়ার ধাপ (সম্ভাব্য):
- স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে আবেদন ফর্ম সংগ্রহ
- প্রয়োজনীয় তথ্য জমা
- যাচাই ও বাছাই
- সুবিধাভোগীর তালিকা প্রকাশ
- ফ্যামিলি কার্ড প্রদান
পরবর্তীতে অনলাইন আবেদন ব্যবস্থাও চালু হতে পারে।
আবেদন করতে যা যা লাগবে
যদিও আবেদন প্রক্রিয়া পুরোপুরি শুরু হয়নি, তবে প্রাথমিকভাবে নিচের কাগজপত্র প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে:
- আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)
- পাসপোর্ট সাইজ রঙিন ছবি
- সচল মোবাইল নম্বর
ভবিষ্যতে আয় সংক্রান্ত তথ্য বা পারিবারিক তথ্যও প্রয়োজন হতে পারে।
আবেদন কোথায় করবেন?
পাইলট প্রকল্প শেষ হওয়ার পর আবেদন করা যাবে:
- ইউনিয়ন পরিষদ অফিস
- পৌরসভা কার্যালয়
- সিটি কর্পোরেশন কাউন্সিলর অফিস
এছাড়া দ্রুত আবেদন প্রক্রিয়ার জন্য একটি অনলাইন পোর্টাল চালুর প্রস্তুতি চলছে।
⚠️ প্রতি পরিবারে একটি মাত্র ফ্যামিলি কার্ড ইস্যু করা হবে।
সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
সরকারের লক্ষ্য:
- দেশের সব দরিদ্র পরিবারকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনা
- সরকারি সহায়তা ব্যবস্থাকে ডিজিটাল করা
- মধ্যস্বত্বভোগী কমানো
- সঠিক ব্যক্তির কাছে সহায়তা পৌঁছানো
প্রকল্প সফল হলে এটি বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
ফ্যামিলি কার্ড সম্পর্কিত FAQ (প্রশ্ন–উত্তর)
১️. ফ্যামিলি কার্ড কী?
ফ্যামিলি কার্ড হলো সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির একটি বিশেষ সুবিধা, যার মাধ্যমে দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারকে নগদ অর্থ বা অন্যান্য সহায়তা দেওয়া হয়। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজ করছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়।
২️. ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে কী সুবিধা পাওয়া যায়?
- মাসিক নগদ অর্থ সহায়তা (প্রস্তাবিত প্রায় ২ হাজার টাকা)
- আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো
- সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা
- কিছু ক্ষেত্রে ভর্তুকি মূল্যে পণ্য পাওয়ার সুযোগ
৩️. কারা ফ্যামিলি কার্ড পাবেন?
সাধারণত নিচের পরিবারগুলো অগ্রাধিকার পাবে:
- হতদরিদ্র পরিবার
- নিম্ন আয়ের পরিবার
- কর্মহীন বা অনিশ্চিত আয়ের মানুষ
- অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার
সরকার নির্ধারিত তালিকা অনুযায়ী সুবিধাভোগী নির্বাচন করা হবে।
৪️. ফ্যামিলি কার্ডের জন্য কীভাবে আবেদন করবেন?
পাইলট প্রকল্প শেষ হওয়ার পর—
- ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা কাউন্সিলর অফিস থেকে আবেদন করা যাবে
- ভবিষ্যতে অনলাইন আবেদন ব্যবস্থাও চালু হতে পারে
৫️. আবেদন করতে কী কী লাগবে?
প্রাথমিকভাবে নিচের কাগজপত্র প্রয়োজন হতে পারে:
- জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)
- পাসপোর্ট সাইজ ছবি
- সচল মোবাইল নম্বর
৬️. প্রতি পরিবারে কয়টি কার্ড দেওয়া হবে?
প্রতি পরিবারে সাধারণত একটি ফ্যামিলি কার্ড ইস্যু করা হবে।
৭️. কবে থেকে ফ্যামিলি কার্ড চালু হবে?
প্রথমে পাইলট প্রকল্প হিসেবে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় শুরু হবে। প্রকল্প সফল হলে ধাপে ধাপে সারা দেশে চালু করা হবে।
৮️. সহায়তার টাকা কার হাতে দেওয়া হবে?
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী পরিবারের নারী সদস্য বা গৃহকর্ত্রীর হাতে সহায়তার অর্থ দেওয়া হতে পারে, যা নারীর ক্ষমতায়নে সহায়ক হবে।
৯️. ফ্যামিলি কার্ডের তালিকা কীভাবে তৈরি হবে?
জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ও সরকারি জরিপের ভিত্তিতে উপকারভোগীর তালিকা তৈরি করা হবে এবং স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে যাচাই করা হবে।
